বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান ই-বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন WEEE Society Bangladesh-এর সাধারণ সম্পাদক আকতার উল আলম।
আন্তর্জাতিক ই-বর্জ্য দিবস ২০২৫ উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে সরকার, এনজিও, গবেষক ও শিল্পখাতের প্রতিনিধিরা বলেন— ই-বর্জ্য এখন গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে, তাই কার্যকর নীতি ও সচেতনতা জরুরি।
শোয়েব জামান: ঢাকা, ১৪ অক্টোবর ২০২৫
দেশের ক্রমবর্ধমান ই-বর্জ্য (E-Waste) ব্যবস্থাপনা নিয়ে যথাযথ নীতি প্রয়োগ ও সচেতনতার অভাবের কারণে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে WEEE (Waste Electrical and Electronic Equipment) Society Bangladesh। সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২১ সালের “Electronic Waste Management Rules” কার্যকর না হওয়ায় ভোক্তারা এখনো জানেন না কীভাবে ইলেকট্রনিক বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হয়। এর ফলে এসব বর্জ্য অনানুষ্ঠানিক খাতে অসচেতনভাবে বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে, যা পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে।
WEEE সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক জনাব আকতার উল আলম আজ রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত রাউন্ড টেবিল আলোচনায় তার বক্তব্য উপস্থাপন করেন। “Advancing Circular Economy with Formal Electronic-Waste Management: Policy Frameworks & Stakeholders’ Responsibility” শীর্ষক এই সেমিনারটি আয়োজিত হয় আন্তর্জাতিক ই-বর্জ্য দিবস ২০২৫ উপলক্ষে।
সেমিনারের মূল উদ্দেশ্য ছিল এনজিও, সামাজিক সংগঠন, নীতিনির্ধারক, গবেষক ও সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত আলোচনার মাধ্যমে দেশের ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার টেকসই কাঠামো নিয়ে মতবিনিময় করা।
এর আগে WEEE Society Bangladesh সরকারি সংস্থা, ইলেকট্রনিক ও টেলিকম শিল্প, একাডেমিশিয়ান, নীতিনির্ধারক ও স্থানীয় সমাজভিত্তিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিক পরামর্শ সভা করেছে, যাতে একটি কার্যকর ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়ন করা যায়।
আজকের সেমিনারে উক্ত পরামর্শ সভার ফলাফল উপস্থাপনকালে জনাব আকতার উল আলম বলেন,
“বর্তমানে ই-বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ মূলত অনানুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানই আনুষ্ঠানিকভাবে রিসাইক্লিংয়ের কাজ করছে। আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। তাছাড়া এখনো পর্যন্ত কোনো Extended Producer Responsibility (EPR) কাঠামো নেই, যা ইলেকট্রনিক উৎপাদকদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দায়বদ্ধ করবে।”
পরিবেশ অধিদপ্তরের বর্জ্য ও রাসায়নিক ব্যবস্থাপনা শাখার পরিচালক মিসেস রাজিনারা বেগম বলেন,
“২০২১ সালের ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি, তবে এটি পুনর্বিবেচনার কাজ চলছে। এই প্রক্রিয়ায় আমরা বিধিমালাকে আরও কার্যকর করার সুযোগ পাচ্ছি।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বই মূলত এই বিধিমালা বাস্তবায়নের বিষয়টি নিশ্চিত করা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. খোন্দকার মোহাম্মদ শরীফুল হুদা বলেন,
“ই-বর্জ্য এখন আর কেবল নগরাঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই, এটি গ্রামীণ এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ছে। তাই ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতিতে নতুন বাস্তবতার প্রতিফলন থাকা জরুরি।”
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কমিশনার মি. মাহমুদ হোসেন বলেন,
“টেলিকম খাতে নেটওয়ার্ক-সম্পর্কিত ই-বর্জ্যের পরিমাণ প্রায় পাঁচ শতাংশ, কিন্তু অধিকাংশ বর্জ্যই আসে ব্যবহৃত মোবাইল হ্যান্ডসেট থেকে। আমরা নেটওয়ার্কের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পদক্ষেপ নিয়েছি, তবে হ্যান্ডসেটজনিত বর্জ্যের নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হওয়া দরকার।”
আলোচকরা আরও বলেন, দেশে প্রতি বছর কত ই-বর্জ্য উৎপন্ন ও পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ হচ্ছে — তার নির্ভরযোগ্য কোনো কেন্দ্রীয় তথ্য নেই। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যদিও পুরোনো ইলেকট্রনিক পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ, তবুও অবৈধভাবে এসব পণ্য দেশে প্রবেশ করছে।
সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন ড. রওশন মামতাজ, পরিচালক, আইটিএন-বিইউইটি; প্রফেসর এম. শাহিদুল ইসলাম, চেয়ারম্যান, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; মি. রকিবুল হাসান, সহকারী পরিচালক, হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ; এবং জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি (JICA) ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB)-এর প্রতিনিধি বৃন্দ।
WEEE Society Bangladesh একটি নিবন্ধিত সামাজিক সংস্থা, যা জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে কাজ করে যাচ্ছে। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন যত দ্রুত ঘটছে, ততই ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখন এক জরুরি অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে। পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সংস্থাটি পরিবেশসম্মত উপায়ে ই-বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনঃব্যবহারের কার্যক্রম নথিবদ্ধ করে থাকে। অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনায় ছিলেন, সুমন আহমেদ সাবীর চেয়ারপার্সন WEEE Society Bangladesh.
তথ্যসূত্র ও পরিসংখ্যান (Facts & References):
- ই-বর্জ্য (E-Waste) বলতে বোঝায় এমন সব ইলেকট্রনিক ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি যা ব্যবহারযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে বা নষ্ট হয়ে গেছে।
🔹 Source: Global E-Waste Monitor, 2024; United Nations Institute for Training and Research (UNITAR). - ই-বর্জ্যে থাকে বিপজ্জনক ধাতু — যেমন সীসা (Lead), পারদ (Mercury), ক্যাডমিয়াম (Cadmium), ক্রোমিয়াম (Chromium) — এবং পাশাপাশি মূল্যবান ধাতু যেমন সোনা (Gold), রুপা (Silver), তামা (Copper) ইত্যাদি। এসব ধাতু অনিয়ন্ত্রিতভাবে পুনঃব্যবহার বা পোড়ানো হলে পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে।
🔹 Source: World Health Organization (WHO) Report on E-Waste and Health, 2023. - বাংলাদেশে ই-বর্জ্য উৎপাদন ও পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের কোনো কেন্দ্রীয় জাতীয় তথ্যভান্ডার (Central Database) এখনো গড়ে ওঠেনি। ফলে পরিসংখ্যান নির্ভর পরিকল্পনা গ্রহণে চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
🔹 Source: Department of Environment (DoE), Ministry of Environment, Forest and Climate Change, Bangladesh; Policy Brief on E-Waste, 2024. - গ্লোবাল ই-ওয়েস্ট মনিটর ২০২৪ (Global E-Waste Monitor 2024) অনুসারে, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন কেজি ই-বর্জ্য উৎপন্ন হয়।
🔹 Source: Global E-Waste Monitor 2024 (UNITAR, ITU, ISWA). - ২০২০–২১ অর্থবছরে, বাংলাদেশের পৌরসভাগুলোর মোট কঠিন বর্জ্যের (Municipal Solid Waste – MSW) মধ্যে ই-বর্জ্যের পরিমাণ ছিল ২.২৯%, এবং সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ২.৪৪%।
🔹 Source: Municipal Waste Management (MWM) Survey, Waste Concern, 2022. - ২০২৪ সালে, বাংলাদেশের ই-বর্জ্যের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩৬৭ মিলিয়ন কেজি, যা মোট বর্জ্যের প্রায় ২.৩% — যা স্পষ্টভাবে ক্রমবর্ধমান প্রবণতা নির্দেশ করে।
🔹 Source: Islam, M. T., Rahman, S., & Huda, K. M. S. (2025). “Trends in Electronic Waste Generation and Recycling Practices in Bangladesh.” Journal of Environmental Science and Policy, Vol. 12, Issue 1, pp. 45–58.
বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণ, প্রযুক্তি ব্যবহারের বিস্তার, এবং ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার ই-বর্জ্য সৃষ্টির হারকে বহুগুণে বাড়িয়ে তুলছে। সঠিক ব্যবস্থাপনা ও নীতিমালা বাস্তবায়ন না হলে এটি জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য একটি গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।











