রূপালীদেশ ডেস্ক:
দেশের অন্যতম আলোচিত শিল্পগোষ্ঠী সিকদার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রন হক সিকদার আর নেই। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার (০৪ মে) তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন বলে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। মৃত্যুকালে তিনি পরিবার-পরিজন ও ঘনিষ্ঠজনদের শোকের সাগরে ভাসিয়ে গেছেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, রন হক সিকদার দীর্ঘদিন ধরে লিভারজনিত জটিলতায় ভুগছিলেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে দুবাইয়ের মেডিক্লিনিক পার্কভিউ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যু সংবাদ নিশ্চিত হওয়ার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে শোকের ছায়া নেমে আসে।
ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক প্ল্যাটফর্মে তার মৃত্যুর খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই স্ট্যাটাসের মাধ্যমে শোক প্রকাশ করেন এবং তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, “রন সিকদার এইমাত্র মারা গেছেন, আল্লাহ তাকে জান্নাতে চিরশান্তিতে রাখুন।” এ ধরনের বহু প্রতিক্রিয়া তার পরিচিতি ও প্রভাবের প্রতিফলন বহন করে।
রন হক সিকদার ছিলেন দেশের প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠী সিকদার গ্রুপের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি প্রয়াত শিল্পপতি ও সিকদার গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা জয়নুল হক সিকদারের মেজো ছেলে। পারিবারিক ঐতিহ্য অনুসরণ করে তিনি ব্যবসায়িক কার্যক্রমে যুক্ত হন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেন। এছাড়া তিনি ন্যাশনাল ব্যাংকের সাবেক পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
তবে তার জীবন ও কর্মজীবন শুধুমাত্র ব্যবসায়িক সফলতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং বিভিন্ন বিতর্ক ও আইনি জটিলতাও তাকে ঘিরে ছিল। বিশেষ করে ২০২০ সালের ১৯ মে একটি বহুল আলোচিত ঘটনায় তার নাম সামনে আসে। ওই সময় এক্সিম ব্যাংকের দুই কর্মকর্তাকে নির্যাতন ও গুলি করে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে গুলশান থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় রন হক সিকদার ও তার ভাই দিপু হক সিকদারকে আসামি করা হয়। ঘটনার পর থেকেই তারা পলাতক ছিলেন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়।
এছাড়াও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) রন হক সিকদার এবং তার ভাইদের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে একাধিক মামলা ও তদন্ত পরিচালনা করে আসছিল। এসব মামলায় তাদের বিরুদ্ধে প্রায় ৭১ কোটি টাকা বিদেশে পাচার এবং নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে আদালত তাদের বিরুদ্ধে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং ২০৩টি ব্যাংক হিসাব ও বিভিন্ন স্থাবর সম্পদ জব্দের নির্দেশ দেয়।
আইনি জটিলতা এড়াতে রন হক সিকদার দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাইরে অবস্থান করছিলেন। বিশেষ করে থাইল্যান্ড ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে তার অবস্থানের তথ্য বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ফলে তার অনুপস্থিতি এবং চলমান মামলাগুলো তাকে দেশের অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত ব্যবসায়ীতে পরিণত করে।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও সিকদার পরিবারের প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সিকদার গ্রুপ এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। বিশেষ করে সিকদার গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা জয়নুল হক সিকদার আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের সহযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এই সম্পর্কের প্রভাব ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হয়েছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে।
রন হক সিকদারের মৃত্যুতে একদিকে যেমন তার পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে, অন্যদিকে তার জীবনের বিতর্কিত অধ্যায়গুলোও নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। ব্যবসায়িক সাফল্য, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং আইনি জটিলতার এক মিশ্র বাস্তবতায় গড়ে ওঠা তার জীবন বাংলাদেশের কর্পোরেট ও রাজনৈতিক অঙ্গনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তার মরদেহ কবে দেশে আনা হবে এবং কোথায় দাফন করা হবে—এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানা যায়নি। পরিবারের পক্ষ থেকে পরবর্তী আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
রন হক সিকদারের মৃত্যু দেশের ব্যবসায়ী মহলে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি করলেও, তার রেখে যাওয়া বিতর্ক ও আইনি প্রশ্নগুলো ভবিষ্যতেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।





