আ ফ ম আবদুল আজিজের ‘দৈনন্দিন ন্যূনতম ইবাদত’ ও ফেরদৌসী মজুমদারের ‘বন্ধু আমার’ প্রকাশিত; অনুষ্ঠানে প্রফেসর ড. এম সিরাজুল ইসলামের জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য
ঢাকা | ২৮ আগস্ট ২০২৬ | শোয়েব জামান, বিশেষ সংবাদদাতা
রাজধানীর ধানমন্ডিস্থ ড্যাফোডিল প্লাজার ‘৭১ হলে’ এক আনন্দঘন ও আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিশিষ্ট প্রকৌশলী আ ফ ম আবদুল আজিজ এবং শিক্ষাবিদ ফেরদৌসী মজুমদার-এর দুটি নতুন বইয়ের প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। অয়ন প্রকাশনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে সাহিত্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক চিন্তাচর্চার সঙ্গে যুক্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এটিএন বাংলা (বার্তা বিভাগ)-এর উপদেষ্টা ও সিইও হাসান শরীফ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিনিয়র সিটিজেন ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শেখ মোঃ খবির উদ্দীন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে হাসান শরীফ লেখকদ্বয়ের সৃজনশীলতা, জীবনদর্শন ও সাহিত্যকর্মের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, প্রকৌশলী আ ফ ম আবদুল আজিজ তাঁর ‘দৈনন্দিন ন্যূনতম ইবাদত’ বইয়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ধর্মীয় অনুশাসন ও ইবাদতের বিষয়গুলো সহজভাবে তুলে ধরার প্রয়াস নিয়েছেন। অন্যদিকে ফেরদৌসী মজুমদার সম্পাদিত ‘বন্ধু আমার’ গ্রন্থটি মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, স্মৃতি ও মানবিক অনুভূতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকলন হিসেবে পাঠকের কাছে তাৎপর্য বহন করবে।
তিনি লেখকদের জীবন ও কর্মের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে তাঁদের প্রকাশিত ও প্রকাশিতব্য গ্রন্থের সাফল্য কামনা করেন।
বিজ্ঞানের যুক্তি ও আধ্যাত্মিক দর্শনের সমন্বয়ের কথা বললেন ড. সিরাজুল ইসলাম
অনুষ্ঠানের অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ ছিলেন জ্ঞানতাপস, প্রথিতযশা কৃষি অর্থনীতিবিদ ও মননশীল লেখক প্রফেসর ড. এম সিরাজুল ইসলাম। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে জ্ঞানচর্চা, সাহিত্য, জীবনদর্শন, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং মানুষের আত্মিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
প্রফেসর ড. সিরাজুল ইসলাম লেখকদের সাহিত্যিক নিষ্ঠার প্রশংসা করে বলেন, সৃজনশীল লেখা শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি মানুষের চিন্তা, বিবেক, মূল্যবোধ ও জীবনবোধকে সমৃদ্ধ করার শক্তিশালী মাধ্যম। একজন লেখক যখন নিজের জীবন-অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও উপলব্ধিকে লেখার মাধ্যমে মানুষের সামনে তুলে ধরেন, তখন সেই লেখা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সীমা অতিক্রম করে সমাজের জন্য সম্পদে পরিণত হতে পারে।
নিজের লেখালেখির প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি তাঁর বিভিন্ন গ্রন্থের বিষয়বস্তু নিয়েও আলোচনা করেন। তাঁর লেখায় যেমন জীবন ও সমাজকে বোঝার চেষ্টা রয়েছে, তেমনি রয়েছে ধর্ম, বিজ্ঞান, মহাবিশ্ব, মানবজীবন এবং পরকাল নিয়ে চিন্তার সমন্বয়।
তিনি তাঁর ‘জীবন দর্শন’ ও ‘জীবন ধারা’ গ্রন্থের প্রসঙ্গে জীবনকে কেবল পার্থিব সাফল্যের দৃষ্টিতে না দেখে এর গভীর অর্থ ও উদ্দেশ্য উপলব্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। মানুষের দৈনন্দিন জীবন, চিন্তা, আচরণ, নৈতিকতা এবং আত্মিক উপলব্ধি—সবকিছুর মধ্যেই জীবনের প্রকৃত দর্শন খুঁজে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি তুলে ধরেন।
তাঁর ‘মাটির বাড়ী’ গ্রন্থে স্মৃতি ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের মাধ্যমে মানুষের শেকড়, পারিবারিক বন্ধন, অতীত সমাজ ও জীবনযাপনের নানা অনুষঙ্গ উঠে এসেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, মানুষের অতীতকে জানা এবং শেকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা বর্তমান প্রজন্মের জীবনবোধকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে।
ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক চিন্তার ক্ষেত্রে তাঁর ‘আল কুরআন: অনুবাদ ও তাফসীর’, ‘কুরআনুল কারীম’, ‘নবী-রাসূলদের জীবনী’ এবং ‘ইহকাল ও পরকাল’ গ্রন্থের বিষয়বস্তু নিয়েও তিনি আলোকপাত করেন। এসব রচনায় কুরআনের শিক্ষা, নবী-রাসূলদের জীবন, মানবজীবনের উদ্দেশ্য এবং ইহকাল-পরকালের সম্পর্ককে বোঝার একটি চিন্তাশীল প্রয়াস রয়েছে।
বিশেষভাবে ‘মহাবিশ্ব ও আল কুরআন’ গ্রন্থের প্রসঙ্গে তিনি জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল—বিজ্ঞান মানুষকে প্রকৃতি ও মহাবিশ্বের কার্যপ্রণালি বুঝতে সাহায্য করে, আর আধ্যাত্মিক জ্ঞান মানুষকে সেই জ্ঞানকে জীবন ও সৃষ্টির বৃহত্তর অর্থের সঙ্গে যুক্ত করে দেখতে সহায়তা করে। অর্থাৎ যুক্তিবোধ ও আত্মিক উপলব্ধি পরস্পরের বিরোধী না হয়ে মানুষের জ্ঞানচর্চাকে আরও বিস্তৃত করতে পারে।
এ প্রসঙ্গে তাঁর ‘কুরআনে নির্দেশিত বরকতময় এলাকা ভ্রমণ ও পরিদর্শন’ গ্রন্থের কথাও উঠে আসে। ভ্রমণকে শুধু বিনোদন হিসেবে না দেখে ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য, সভ্যতা ও আত্মিক উপলব্ধির সঙ্গে যুক্ত করার একটি দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর লেখায় প্রতিফলিত হয়েছে।
প্রফেসর ড. সিরাজুল ইসলামের বক্তব্যে আরও উঠে আসে—একটি ভালো বই মানুষের চিন্তার জগতে প্রশ্ন তৈরি করে, উত্তর খুঁজতে উৎসাহিত করে এবং নিজের জীবনকে নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ করে দেয়। তাই সমাজে জ্ঞানভিত্তিক ও মূল্যবোধসম্পন্ন সাহিত্যচর্চা বাড়ানো প্রয়োজন।
প্রবীণ-নবীনের সমন্বয়ে সাহিত্যচর্চার আহ্বান
সভাপতির বক্তব্যে শেখ মোঃ খবির উদ্দীন বলেন, প্রবীণ ও নবীন লেখকদের সমন্বয়ে এ ধরনের প্রকাশনা উৎসব দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করবে। প্রবীণদের দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও উপলব্ধি নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন অয়ন প্রকাশনের প্রকাশক মিঠু কবির। আরও উপস্থিত ছিলেন প্রফেসর ড. সেলিমা সাঈদ, সাবেক যুগ্মসচিব দীপক কুমার চৌধুরী, কবি আসাদ কাজল এবং বাংলাদেশ লেখিকা সংঘের সভাপতি প্রফেসর অনামিকা হক লিলিসহ সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
আলোচনা সভা শেষে অতিথিবৃন্দ আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বন্ধু আমার’ ও ‘দৈনন্দিন ন্যূনতম ইবাদত’ বই দুটির মোড়ক উন্মোচন করেন।
সার্বিকভাবে অনুষ্ঠানটি ছিল সাহিত্য, জ্ঞান, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মানবিক সম্পর্ককে কেন্দ্র করে একটি অর্থবহ আয়োজন। নতুন দুই গ্রন্থের প্রকাশনার মধ্য দিয়ে লেখকদ্বয় পাঠকের চিন্তার জগতে নতুন মাত্রা যোগ করবেন—এমন প্রত্যাশাই ব্যক্ত করেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথি ও শুভানুধ্যায়ীরা।
