Home মতামত ছিনতাইয়ের রাজত্ব: আইনের দুর্বলতা কি অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে?

ছিনতাইয়ের রাজত্ব: আইনের দুর্বলতা কি অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে?

0
ছিনতাইয়ের নতুন রূপ: শুধু অর্থ নয়, প্রাণও ঝরে যায়
মোঃ আখতারুজ্জামান মল্লিক_
ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক, কলামিস্ট ও ব্যবসায়ী
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা

মোঃ আখতারুজ্জামান মল্লিক-


রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য শহরে ছিনতাই এখন একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন নিরীহ মানুষ। অফিসগামী কর্মজীবী, শিক্ষার্থী, রোগী, ব্যবসায়ী—কারো জন্যই সড়কে নিরাপত্তা নেই। ছিনতাইয়ের ভয়ে মানুষ আজ রাতে চলাচল তো বটেই, দিনেও শঙ্কায় ভোগে।

এই পরিস্থিতি কেবল আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা নয়, এটি বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা ও আইনের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ছিনতাইয়ের ধরণ পাল্টে এখন তা প্রাণঘাতী আক্রমণের রূপ নিচ্ছে। প্রতিরোধের চেষ্টা করলে ছুরিকাঘাত, গুলি করা এমনকি এসিড নিক্ষেপের মতো নৃশংস হামলাও হচ্ছে।

ছিনতাইয়ের নতুন রূপ: শুধু অর্থ নয়, প্রাণও ঝরে যায়

এক সময় ছিনতাই মানেই ছিল মোবাইল ফোন বা মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া। কিন্তু এখন ছিনতাইকারীরা প্রাণঘাতী অস্ত্র নিয়ে বের হয়। রাজধানীর রাস্তায়, বাসে কিংবা অন্ধকার গলিতে যেকোনো সময় ছিনতাইয়ের শিকার হওয়া যায়। অনেক সময় পথচারীদের মৃত্যুও ঘটছে প্রতিরোধ করতে গিয়ে। এসব ঘটনা উদ্বেগ বাড়ানোর পাশাপাশি জনমানুষের মনে এক প্রকার অসহায়ত্বের জন্ম দেয়।

পুলিশি নজরদারি ও বাস্তবতা

অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ প্রশাসন মাঝে মাঝে কিছু অভিযান চালালেও তা দীর্ঘমেয়াদি নয়। ছিনতাইকারীরা পুলিশের টহল রুট এবং সময় সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকে। তাই তারা এমন এলাকা ও সময় বেছে নেয়, যেখানে পুলিশের উপস্থিতি কম। ফলে অপরাধ করে সহজেই পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়।

তদুপরি, থানায় অভিযোগ দিতে গেলে সাধারণ মানুষের নানা হয়রানির শিকার হতে হয়। অনেক সময় মামলা নিতে গড়িমসি করা হয় বা গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ফলে ভুক্তভোগী আইনের প্রতি আস্থা হারায়, যা সামগ্রিকভাবে বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের বিশ্বাসে চিড় ধরায়।

বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা: অপরাধীর আত্মবিশ্বাসের উৎস

আইনের চোখে ছিনতাই একটি গুরুতর অপরাধ হলেও বাস্তবে শাস্তির নজির খুব কম। অপরাধী ধরা পড়লেও আদালতে অভিযোগ প্রমাণ করতে সময় লাগে বহু বছর। অনেক সময় সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে তারা ছাড়া পেয়ে যায়।

সাক্ষীরা ভয় পায় আদালতে হাজিরা দিতে। আবার অনেকে অপরাধীর প্রভাবের কারণে মুখ খুলতে চায় না। আইনজীবী নিয়োগ, নিয়মিত হাজিরা, আর্থিক খরচ—এসব কারণে অনেকেই মামলা চালাতে পারেন না। ফলে অপরাধী জামিনে বেরিয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

ভুক্তভোগীর ভয়: ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা থেমে যায়

অপরাধের শিকার হয়ে থানায় গেলে প্রথমেই মুখোমুখি হতে হয় হয়রানির। মামলা নিতে গড়িমসি, আবার কখনও কখনও পাল্টা ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। এরপর আদালতে যেতে হলে ভুক্তভোগীকে ভোগান্তির শেষ থাকে না। এতে আইনের শরণাপন্ন হওয়ার আগ্রহ অনেকের মাঝেই কমে যায়।

একজন সাধারণ মানুষ আইনি সহায়তা পেতে গিয়ে যে পরিমাণ সময়, অর্থ এবং মানসিক চাপের ভেতর দিয়ে যায়, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। রাষ্ট্র যদি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে না পারে, তবে মানুষের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়, যা সমাজের জন্য আরও ভয়ঙ্কর।

আইনের দুর্বলতা ও অপরাধীদের দুঃসাহস

ছিনতাইকারীরা জানে—আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যদি আটক করেও, আদালতে অভিযোগ প্রমাণ কঠিন। আবার শাস্তি কার্যকর হতে অনেক সময় লাগে। এই জানাশোনাই তাদের অপরাধ করতে উৎসাহিত করে। তারা বুঝে গেছে, আইনের দুর্বলতা এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা তাদের জন্য সেফ জোন।

এ কারণে ছিনতাই এখন নেশার মতো একটি অপরাধে রূপ নিয়েছে, যেখানে অপরাধী বারবার জামিন পেয়ে নতুন করে একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এ অবস্থায় আইনের শক্ত প্রয়োগ ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা

শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নয়, সামাজিক পর্যায়েও আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল। সড়কে সিসিটিভি ক্যামেরার স্বল্পতা, এলাকা পর্যায়ে কমিউনিটি নজরদারির অভাব, দ্রুত প্রতিক্রিয়ার ব্যবস্থা না থাকা ইত্যাদি কারণে ছিনতাই প্রতিরোধ সম্ভব হয় না।

কমিউনিটি পুলিশিং-এর কার্যকর প্রয়োগ, প্রতিটি থানা এলাকায় মোবাইল টহল, সন্দেহজনক চলাফেরার ওপর নজরদারি—এসব ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি। একইসঙ্গে জনগণের সচেতনতা বাড়াতে হবে। কেউ সন্দেহজনক কাউকে দেখলে, সেটি দ্রুত জানাতে হবে স্থানীয় প্রশাসনকে।

প্রযুক্তির ব্যবহার: অপরাধ দমনে আধুনিকতা জরুরি

আজকের দিনে প্রযুক্তি ছাড়া কোনো অপরাধ দমন সম্ভব নয়। ছিনতাই প্রতিরোধে শহরজুড়ে সিসিটিভি ক্যামেরার নেটওয়ার্ক, স্বয়ংক্রিয় মনিটরিং ব্যবস্থা, অপরাধ বিশ্লেষণ সফটওয়্যার এবং ড্রোন নজরদারি ব্যবহারের মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। প্রতিটি থানায় ডিজিটাল কন্ট্রোল রুম থাকতে হবে।

এর পাশাপাশি, নাগরিক সহায়তায় একটি মোবাইল অ্যাপ চালু করা যেতে পারে, যেখানে মানুষ দ্রুত অভিযোগ জানাতে পারবে, লাইভ ভিডিও দিতে পারবে কিংবা অবস্থান জানিয়ে সহায়তা চাইতে পারবে।

জনগণের আস্থা ফেরানোই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

ছিনতাই ও আইনশৃঙ্খলার এই সংকটময় সময়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—আইনের প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। মানুষকে বুঝিয়ে দিতে হবে যে, আইনের হাতে অপরাধীরা নিরাপদ নয়। এজন্য প্রয়োজন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, দ্রুত বিচার এবং পুলিশি সেবার উন্নয়ন।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে বিচারব্যবস্থায় সংস্কার, প্রক্রিয়া সংক্ষিপ্তকরণ, রাষ্ট্রীয়ভাবে আইনজীবী সহায়তা, ও সাক্ষী সুরক্ষার মতো ব্যবস্থা নিতে হবে।

আর দেরি নয়, ব্যবস্থা নিন এখনই

ছিনতাই প্রতিরোধে শুধু কঠোর আইন করলেই হবে না, সেই আইনের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। বিচারপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা কাটাতে হবে, পুলিশ প্রশাসনের দায়বদ্ধতা বাড়াতে হবে, এবং প্রযুক্তি নির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

আমরা যদি এখনই পদক্ষেপ না নিই, তবে অচিরেই এই সমস্যা একটি দুর্নিবার দুর্যোগে পরিণত হবে। রাজধানী সহ সারা দেশের মানুষ চায় নিরাপদ জীবন, ন্যায়বিচার ও শান্তিপূর্ণ সমাজ। সেই প্রত্যাশা পূরণে রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরে কার্যকর পরিবর্তন জরুরি।

লেখক মোঃ আখতারুজ্জামান মল্লিক একজন ইসলামী চিন্তাবিদ, গবেষক ও সমাজসেবক তিনি একজন প্রগতিশীল লেখক ও বিশ্লেষক। তিনি “আল কোরানের আলোকে নিষিদ্ধ ইবাদত” বইয়ের প্রণেতা। ধর্মীয় জ্ঞান ও সামাজিক কল্যাণে অঙ্গীকারবদ্ধ এই লেখক নেত্রকোনার কেকন্দুয়া উপজেলার পালড়া এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘মল্লিক ইসরাফিল-আছিয়া মাদরাসাতুস্ সুন্নাহ্’ ও একটি জামে মসজিদ। তিনি একজন দায়িত্বশীল ব্যবসায়ী হলেও লেখালেখি ও কলামচর্চায় সক্রিয়ভাবে জড়িত। নিয়মিতই তিনি সামাজিক, ধর্মীয় ও নৈতিক বিষয়ে গণমাধ্যমে মতামত প্রকাশ করে থাকেন। বসবাস করেন রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায়।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Exit mobile version