মোঃ আক্তারুজ্জামান মল্লিক:
আনুমানিক ২০১০–২০১২ সাল থেকে সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিশেষ করে তিতাস গ্যাস বিতরণ এলাকার অধীনে নতুন আবাসিক গ্যাস সংযোগ এবং বিদ্যমান সংযোগে অতিরিক্ত চুলা বাড়ানোর অনুমোদন বন্ধ রয়েছে। কিন্তু গত দেড় দশকে দেশের নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং মানুষের জীবনযাত্রায় এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। ফলে সে সময়ের বাস্তবতার ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্তের সঙ্গে বর্তমান নগরজীবনের বাস্তবতার একটি বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
একসময় একটি একতলা বা টিনশেড বাড়িতে একটি বৈধ দ্বিমুখী বা ডাবল-বার্নার চুলার অনুমোদন ছিল। সময়ের সঙ্গে সেই একই জায়গায় গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন। একটি ভবনের প্রতিটি তলায় তৈরি হয়েছে একাধিক পৃথক ফ্ল্যাট বা ইউনিট। ভবনের পরিধি ও বসবাসকারী পরিবারের সংখ্যা বাড়লেও অতিরিক্ত চুলার বৈধ অনুমোদনের সুযোগ তৈরি হয়নি।
অনেক বাড়ির মালিক অতিরিক্ত চুলার অনুমোদনের জন্য বারবার আবেদন করলেও তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমোদন পাননি। ফলে বাস্তবতার চাপে অনেকেই পুরোনো বৈধ সংযোগ ও মূল রাইজারের সুযোগ নিয়ে ভবনের অন্যান্য ফ্ল্যাট বা ইউনিটে অননুমোদিতভাবে গ্যাসের লাইন সম্প্রসারণ করেছেন। এভাবেই মাঠপর্যায়ে সৃষ্টি হয়েছে একটি জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী পরিস্থিতি।
একটি সুস্থ অর্থনীতি ও কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হলো সুশৃঙ্খল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা। অথচ আবাসিক গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের একটি নীতিগত জটিলতা এখন একদিকে যেমন সরকারের বিপুল রাজস্ব ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, অন্যদিকে তেমনি তৈরি করছে অননুমোদিত সংযোগ, অবৈধ লাইন সম্প্রসারণের সুযোগ।
বৈধ রাইজার, কিন্তু অননুমোদিত বহু চুলা
বর্তমানে অনেক বহুতল ভবনে মূল রাইজার বা প্রাথমিক সংযোগটি বৈধ। কিন্তু সেই সংযোগের আওতায় ভবনের বিভিন্ন ফ্ল্যাটে অতিরিক্ত চুলা যুক্ত হয়েছে, যেগুলোর আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নেই। ফলে বাস্তবে গ্যাস ব্যবহার হচ্ছে, কিন্তু সেই ব্যবহারের বিপরীতে সরকারের প্রাপ্য রাজস্ব যথাযথভাবে আদায় হচ্ছে না ।
খাতায়-কলমে যেখানে একটি বৈধ দ্বিমুখী চুলার বিল পরিশোধ করা হচ্ছে, বাস্তবে সেখানে হয়তো একই সংযোগ থেকে একাধিক পরিবারের বহু চুলা জ্বলছে। অর্থাৎ গ্যাস ব্যবহারের পরিমাণ এবং রাজস্ব আদায়ের মধ্যে তৈরি হয়েছে একটি বড় ধরনের অসামঞ্জস্য ।
এই ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব। নিয়মিত বিলের মাধ্যমে যে অর্থ সরকারি তহবিলে জমা হওয়ার কথা, তার একটি বড় অংশ বৈধ ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছে। একই সঙ্গে এই সুযোগকে কেন্দ্র করে একশ্রেণির অসাধু ব্যক্তি বা চক্র অবৈধ সংযোগ ও লাইন সম্প্রসারণের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে ।
নিষেধাজ্ঞা কি সমস্যার সমাধান করেছে?
দীর্ঘদিনের বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, গৃহস্থালি পর্যায়ে নতুন সংযোগ বা অতিরিক্ত চুলা বন্ধ রাখার নীতি মানুষের গ্যাস ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা বন্ধ করতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে এর ফলে বৈধ ব্যবস্থার বাইরে গ্যাস ব্যবহারের প্রবণতা তৈরি হয়েছে ।
অর্থাৎ যে ব্যবহারকারী নিয়ম মেনে অতিরিক্ত চুলার অনুমোদন নিয়ে বিল দিতে পারতেন, তিনিই যখন সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন, তখন একটি অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার জন্ম হয়। আর এই অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থা একসময় অবৈধ সংযোগ ও দুর্নীতির পথকে আরও প্রশস্ত করে ।
এখানে মূল প্রশ্ন হলো যেখানে অবকাঠামো ও মূল রাইজার আগে থেকেই বিদ্যমান, সেখানে নির্দিষ্ট শর্ত ও নিরাপত্তাবিধি মেনে অতিরিক্ত চুলাগুলোকে নিয়মিত করার সুযোগ দেওয়া হলে কি সরকার বরং বেশি রাজস্ব পেতে পারে না?
রাজস্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি গ্যাস অপচয় রোধের সুযোগ
এই পরিস্থিতির একটি বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে নীতিমালার পুনর্মূল্যায়ন। যেসব ভবনে আগে থেকেই বৈধ রাইজার ও অনুমোদিত সংযোগ রয়েছে, সেসব ভবনের তলা ও ইউনিটের সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে নির্দিষ্ট ফি, নিরাপত্তা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় শর্তসাপেক্ষে অতিরিক্ত চুলা নিয়মিত করার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে ।একই সঙ্গে প্রি-পেইড মিটার স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হলে ব্যবহারের পরিমাণের সঙ্গে অর্থ পরিশোধের একটি সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হবে।
সবশেষে বলা যায়,
যেহেতু নগরায়ণ থেমে নেই এবং মানুষের আবাসন চাহিদাও বাড়ছে। তাই দেড় দশক আগের পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া নীতিমালা বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নতুন করে পর্যালোচনা করা জরুরি । তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের উচিত বাস্তবতাকে অস্বীকার না করে একটি জবাবদিহিমূলক নীতিমালা তৈরি করা। সবাইকে মনে রাখতে হবে একটি স্বচ্ছ, নিরাপদ, নিয়ন্ত্রিত ও রাজস্বমুখী ব্যবস্থাপনাই পারে গ্যাসের অপচয় রোধ করতে এবং রাজস্ব বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে।

ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক, কলামিস্ট ও ব্যবসায়ী
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা