রূপালীদেশ ডেস্ক:
মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলায় কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় উন্নত জাতের হলুদ বীজ বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী কৃষকদের মাঝে উন্নত জাতের হলুদ বীজ বিতরণের কথা থাকলেও বাস্তবে বীজের পরিবর্তে নগদ অর্থ দিয়ে দায় সারার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে স্থানীয় কৃষকদের মাঝে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তাদের যোগসাজশে সরকারি বরাদ্দের একটি বড় অংশ আত্মসাৎ করা হয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এলাকার হলুদ চাষে।
স্থানীয় সূত্র ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি মৌসুমে কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় জনপ্রতি ৬ হাজার ৫০০ টাকা মূল্যের ১০০ কেজি উন্নত জাতের হলুদ বীজ পাওয়ার কথা ছিল নির্বাচিত কৃষকদের। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ কৃষক কোনো বীজ পাননি। এর পরিবর্তে কাউকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা আবার কাউকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা নগদ প্রদান করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কৃষকদের হাতে সরাসরি বীজ পৌঁছে দেওয়ার কথা থাকলেও মাঠপর্যায়ে সেই নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়নি। বরং কৃষকদের নগদ অর্থ দিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। অনেক কৃষক জানান, তারা বীজের আশায় আবেদন করলেও শেষ পর্যন্ত সামান্য কিছু টাকা হাতে পেয়েছেন, যা দিয়ে প্রয়োজনীয় বীজ কেনা সম্ভব হয়নি।
মহম্মদপুর সদর ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুস্মিতা বিশ্বাস জানান, তার ইউনিয়নে দুইজন কৃষক হলুদ প্রণোদনার আওতায় ছিলেন এবং তাদের প্রত্যেককে ৩ হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা পিযুষ রায় স্বীকার করেন যে, বিধি অনুযায়ী বীজ দেওয়ার কথা থাকলেও কৃষকদের নগদ ৪ হাজার ৫০০ টাকা করে প্রদান করা হয়েছে।
এ ঘটনায় আরও বিস্ময়কর তথ্য উঠে এসেছে উপজেলা প্রশাসনের অবস্থান নিয়ে। উপজেলা কৃষি প্রণোদনা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুহাঃ শাহানুর জামান দাবি করেছেন, তিনি হলুদ বীজ বিতরণ বা নগদ অর্থ প্রদানের বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন। বিষয়টি নিয়ে তিনি সম্পূর্ণ অন্ধকারে রয়েছেন বলে জানান। প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের এমন বক্তব্যে স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—তাহলে কার নির্দেশে এবং কীভাবে এই অর্থ বিতরণ করা হলো?
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, প্রণোদনার পুরো সুবিধা না পেয়ে তারা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। উন্নত জাতের হলুদ বীজের পরিবর্তে হাতে পাওয়া সীমিত অর্থ দিয়ে প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। ফলে অনেকেই চলতি মৌসুমে হলুদ চাষ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা গেছে, যেসব কৃষক প্রণোদনার তালিকায় ছিলেন তাদের অনেকেই এবার জমিতে হলুদ রোপণ করেননি। কৃষকদের মতে, যদি সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ করা হতো, তাহলে তারা অধিক উৎপাদনের আশা করতে পারতেন। কিন্তু নগদ অর্থ প্রদানের কারণে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়েছে।
এদিকে অনুসন্ধান শুরু হওয়ার পর কৃষি অফিস থেকে সুবিধাভোগী কৃষকদের ‘হলুদ পেয়েছেন’ বলে বক্তব্য দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। কয়েকজন কৃষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তদন্ত বা সাংবাদিকদের সামনে কী বলতে হবে, তা তাদের শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে নগদ অর্থ দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
মাগুরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ তাজুল ইসলাম প্রথমদিকে দাবি করেন, কৃষকদের সঙ্গে ফোনে কথা বলে তিনি হলুদ বীজ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন। তবে পরে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার নগদ অর্থ প্রদানের স্বীকারোক্তির বিষয়টি সামনে এলে তিনি অবস্থান পরিবর্তন করেন। তিনি বলেন, “বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
সচেতন মহল মনে করছে, কৃষি প্রণোদনার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি কর্মসূচিতে এমন অনিয়ম শুধু কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং সরকারের কৃষিবান্ধব উদ্যোগের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করছে। তাদের মতে, কৃষি খাতে দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ করতে হলে মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, সরকারি বরাদ্দের বাকি অর্থ কোথায় গেল এবং কারা এর সুবিধাভোগী? প্রশাসনের নাকের ডগায় এমন অনিয়ম কীভাবে সংঘটিত হলো, তা নিয়েও এলাকায় তীব্র আলোচনা চলছে। কৃষকদের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হোক, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম আর না ঘটে।





