বিল্লাল বিন কাশেম
নদীকে আমি শেষ কবে ছুঁয়েছি মনে নেই-
হয়তো কোনো শৈশব বিকেলে,
যখন আকাশটা ছিলো নিঃসংকোচ নীল
আর জলের ভেতর নিজের মুখ দেখে
আমি বিশ্বাস করতাম-
এই দেশটাই আমার প্রতিচ্ছবি।
এখন শহর বড় হয়েছে,
মানুষের মতোই তারও শ্বাসকষ্ট আছে-
ধুলো জমে থাকে ফুসফুসে,
আর নদীগুলো যেন
একেকটা ভুলে যাওয়া চিঠি,
খুলে দেখা হয় না,
কিন্তু তবুও বুকের কোথাও বাজতে থাকে।
বাংলাদেশ, তুমি তো নদীরই ভাষায় লেখা-
পদ্মার ঢেউ, মেঘনার বিস্তার,
যমুনার উন্মত্ততা,
আর সেই অগণিত নামহীন খাল,
যাদের বুকের ওপর দিয়ে হেঁটে গেছে
আমাদের প্রজন্মের অযত্ন।
কেন আমরা ভুলে গেলাম?
জলেরও তো স্মৃতি থাকে-
একদিন যে খালে নৌকা ভাসতো,
সেখানে এখন জমেছে বিষণ্ন আগাছা,
শুকিয়ে যাওয়া কাদার গায়ে
শিশুরা খেলে না,
শুধু ইতিহাস নিঃশব্দে কাঁদে।
আমি স্বপ্ন দেখি-
কেউ একজন কোদাল তুলে দাঁড়াবে,
মাটি কেটে খুলে দেবে
জমে থাকা দমবন্ধ পথগুলো,
নদীর শিরা-উপশিরায় আবার ছুটবে রক্ত,
জল হবে জীবন্ত,
চোখের জলের মতো নয়,
বরং হাসির মতো উজ্জ্বল।
নতুন করে খাল কাটার শব্দ
হোক আমাদের জাতীয় সংগীতের মতো-
একটি পুনর্জাগরণের ধ্বনি,
যেখানে প্রতিটি কোপে জেগে উঠবে
হারানো সময়ের নাব্যতা।
তুমি কি জানো,
নদী শুকিয়ে গেলে মানুষের ভেতরও
এক ধরনের শুষ্কতা জন্মায়?
ভালোবাসা তখন আর প্রবাহিত হয় না,
থেমে থাকে-
দুর্বোধ্য, অচল, নিঃসঙ্গ।
তাই আমি চাই-
এই দেশ আবার নদীময় হোক,
জলরেখায় আঁকা হোক নতুন স্বপ্ন,
খালের বাঁকে বাঁকে জেগে উঠুক
গ্রামের ঘ্রাণ,
শহরের ক্লান্তি ধুয়ে যাক
এক মুঠো স্বচ্ছ স্রোতে।
হয়তো একদিন
কোনো তরুণ প্রেমিক দাঁড়াবে নদীর ধারে,
তার হাত ছুঁয়ে বলবে-
“দেখো, এই জলই আমাদের ভবিষ্যৎ”
আর সেই জলে ভেসে উঠবে
একটি সম্ভাবনার বাংলাদেশ।
নদীকে ফিরিয়ে আনা মানে
শুধু পানি নয়-
এটা ফিরিয়ে আনা
আমাদের আত্মা,
আমাদের শিকড়,
আমাদের ভেতরের সেই হারিয়ে যাওয়া মানুষটাকে।
চলো, আবার নদীর কাছে ফিরে যাই-
খাল কাটি, পথ খুলি,
জলকে তার নিজের ভাষায় কথা বলতে দিই।
বাংলাদেশ আবার হোক প্রাঞ্জল,
জলের মতো সহজ,
আর জীবনের মতো অবিরাম।
ষষ্ঠী তলাপাড়া, মুজিব সড়ক, যশোর-৭৪০০।
৩০ এপ্রিল ২০২৬ খ্রী, ১৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বাংলা।
