আশা রহমান:
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নতুন নির্দেশনায় জানানো হয়েছে, কোনো ব্যাংক নিট মুনাফা অর্জন করতে না পারলেও যদি পরিচালন মুনাফা বা অপারেটিং প্রফিট থাকে, তাহলে কর্মীদের উৎসাহ বোনাস বা ইনসেনটিভ প্রদান করা যাবে। এ সিদ্ধান্তকে ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
মঙ্গলবার জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই নতুন নির্দেশনা প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় কিছু শর্ত পূরণ সাপেক্ষে বোনাস প্রদান করা যাবে। বিশেষ করে, ব্যাংকের মূলধনে ঘাটতি থাকলেও নির্দিষ্ট শর্ত মেনে কর্মীদের বোনাস দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো—ব্যাংকের মূলধন আগের বছরের তুলনায় কমে যাওয়া যাবে না। অর্থাৎ, আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা বাধ্যতামূলক।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনক্রমে সর্বোচ্চ এক মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ ইনসেনটিভ বোনাস হিসেবে প্রদান করা যাবে। এতে করে ব্যাংকের কর্মীরা সীমিত হলেও একটি আর্থিক প্রণোদনা পাবেন, যা তাদের কর্মস্পৃহা বাড়াতে সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, কোনো ব্যাংক নিট মুনাফা অর্জন করতে না পারলে কোনো ধরনের উৎসাহ বোনাস দেওয়া যাবে না। পাশাপাশি যেসব ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি বা প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে, সেসব ব্যাংকের ক্ষেত্রেও বোনাস প্রদানে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। এই কঠোর নীতিমালার ফলে বেশ কয়েকটি ব্যাংকের কর্মীদের বোনাস স্থগিত হয়ে যায়, যা কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করে।
এ অবস্থায় ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের সংগঠন এবং মালিকপক্ষের প্রতিনিধিরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে নীতিমালা পুনর্বিবেচনার দাবি জানান। তাদের মতে, ব্যাংকিং খাতে প্রতিযোগিতা বাড়ছে এবং দক্ষ জনবল ধরে রাখা এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বোনাস বা প্রণোদনা না থাকলে কর্মীদের মনোবল কমে যায়, যা সরাসরি সেবার মান ও প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংকিং খাতে মানবসম্পদ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবল ধরে রাখতে হলে তাদের জন্য প্রণোদনা নিশ্চিত করা জরুরি। নতুন এই নীতিমালা সেই দিক থেকে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে একই সঙ্গে ব্যাংকের আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে।
বর্তমান নীতিমালায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বছরে সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ইনসেনটিভ বোনাস গ্রহণ করতে পারবেন। অন্য কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত সীমার বেশি বোনাস দেওয়ার সুযোগ নেই। এর মাধ্যমে অতিরিক্ত বোনাস প্রদানের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে রাখা হচ্ছে।
এদিকে অতীতে কিছু ব্যাংকে বছরে একাধিক বোনাস প্রদানের নজির থাকলেও বর্তমানে সেই সুযোগ সীমিত করা হয়েছে। আর্থিক হিসাব চূড়ান্ত হওয়ার আগে বোনাস প্রদান না করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে, যাতে ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন এই নীতিমালা ব্যাংকিং খাতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান তৈরি করবে। একদিকে কর্মীদের প্রণোদনা নিশ্চিত করা যাবে, অন্যদিকে ব্যাংকের আর্থিক শৃঙ্খলাও বজায় থাকবে। ফলে সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং খাত আরও স্থিতিশীল ও কার্যকর হয়ে উঠবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পদক্ষেপ সময়োপযোগী। কারণ বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে অনেক ব্যাংকই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এমন পরিস্থিতিতে কর্মীদের উৎসাহিত রাখতে প্রণোদনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন এই নীতিমালা সেই প্রয়োজনীয়তাকেই স্বীকৃতি দিয়েছে।
সব মিলিয়ে, নিট মুনাফা ছাড়াও পরিচালন মুনাফার ভিত্তিতে বোনাস প্রদানের সুযোগ চালু হওয়ায় ব্যাংক খাতে কর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর ফলে সেবার মান উন্নয়ন এবং ব্যাংকগুলোর প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ট্যাগ:
